তরুণ প্রজন্মের নানা আসক্তি ও পতনের নেপথ্যে সাত কারণ

ইদানীং তরুণ প্রজন্ম যেসব বড় সমস্যার সম্মুখীন হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন ধরনের আসক্তি। এসব আসক্তি তাদের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যেমন—মাদকাসক্তি, নানা গেমে আসক্তি, অতিরিক্ত কেনাকাটায় আসক্তি ইত্যাদি।
যুবসমাজের মধ্যে বিস্তার লাভ করতে থাকা এসব আসক্তির কারণগুলো সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত—
ব্যক্তিগত কারণ : এই প্রকারের মধ্যে শামিল আছে দুর্বল নৈতিকতা ও ধর্মীয় উদাসীনতা, অতিরিক্ত কৌতূহল, নতুন কিছু চেষ্টা করার অনিয়ন্ত্রিত প্রবণতা, অতিরিক্ত অবসর সময় ইত্যাদি।
সামাজিক কারণ : এই প্রকারের মধ্যে শামিল আছে আইন-কানুন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, মাদক সম্পর্কে ভুল ধারণা, সমাজের অসৎ বন্ধুমহল।
পারিবারিক কারণ : এই প্রকারের মধ্যে শামিল রয়েছে পারিবারিক কলহ, মাতা-পিতার সঙ্গে সন্তানের যোগাযোগ বা কথা বলার অভাব, অহেতুক কড়াকড়ি আচরণ ইত্যাদি।
যুবসমাজ এসব কারণের কোনো একটির শিকার হলেই তার মধ্যে নানা আসক্তির প্রবণতা বেড়ে যায়। তাই আসক্তির নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সব সময় সহজ হয় না।
নিচে সবচেয়ে সাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো তুলে ধরা হলো—
এক. খারাপ বন্ধুদের প্রভাব
শিশু থেকে কৈশোরে পা রাখা সন্তান স্বভাবতই বন্ধুদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চায়। তাই যদি তাদের বন্ধু-সমাজে কেউ মাদক গ্রহণ করে কিংবা কোনো ক্ষতিকর নেশায় আসক্ত হয়, তখন তার সঙ্গে সঙ্গ দেওয়া অন্য বন্ধুটিও সেদিকে ঝুঁকে পড়ে একই অভিজ্ঞতা নিতে চেয়ে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধ্যান-ধারণার অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং তোমাদের সবার খেয়াল রাখা উচিত সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।
অন্য আরেক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর দৃষ্টান্ত হলো, কস্তুরীওয়ালা ও কামারের হাপরের ন্যায়। কস্তুরীওয়ালা হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে কিংবা তার কাছ থেকে তুমি সুবাস পাবে। আর কামারের হাপর হয়তো তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার কাছ থেকে পাবে দুর্গন্ধ।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৫৩৪)
দুই. অদম্য কৌতূহল ও নতুন কিছু চেষ্টার প্রবণতা
তরুণ ও যুবসমাজের একটি স্বাভাবিক স্বভাব হচ্ছে কৌতূহল। নতুন কিছু জানার ও চেষ্টা করার প্রবল আগ্রহ।
কিন্তু অভিজ্ঞতা ও পরিপক্বতা না থাকায় তারা অনেক সময় এমন সব ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ে যেগুলো তাদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে যায়। কাজেই পরিবারের দায়িত্বশীলদের উচিত সন্তান কখন কী করছে সে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা। বিপজ্জনক কিছুতে সম্পৃক্ত হতে দেখলে শুরুতেই বারণ করা।
তিন. পারিবারিক অশান্তি
পরিবারই হলো একজন মানুষের প্রথম বিদ্যালয়, যেখানে তার ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ ও মানসিকতা বেড়ে ওঠে। পরিবারে বারবার ঝগড়াঝাঁটি, মা-বাবার দূরত্ব; এসবের কারণে অনেক তরুণ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। ফলে তারা মাদক বা অন্য কোনো নেশা দিয়ে চাপ ভুলে থাকতে চায়। তাই সন্তানের আগামী বিনির্মাণের কথা ভেবে হলেও সব পরিবারে শান্তি বজায় রাখা উচিত।
চার. দুর্বল ধর্মীয় চেতনা
যে পরিবার তার সন্তানদের যত বেশি ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা সুদৃঢ় করতে পারবে, সঠিক-ভুল চেনাতে পারবে এবং ক্ষতিকর কাজ থেকে দূরে থাকতে পারবে, সেই সন্তান ততটা ভালো থাকবে। কিন্তু যখন এই ভেতরের নিয়ন্ত্রণ বা নৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে যায়, তখন তারা বাইরের প্রলোভনে সহজেই ধরা পড়ে এবং নানা আসক্তিতে জড়িয়ে যায়।
পাঁচ. মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা
অনেক তরুণ যথাযথ মনোযোগ, ভালোবাসা বা প্রশংসা পায় না। আবার তারা নিজেদের প্রতিভা বা দক্ষতা কীভাবে কাজে লাগাবে তা-ও জানে না। তখন ভুল পথে বিশেষত্ব দেখাতে বা মনোযোগ পেতে তারা নানা খারাপ অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে।
ছয়. আসক্তির ক্ষতি সম্পর্কে অজ্ঞতা
বিভিন্ন প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও অনেকে এখনো মাদক ও অন্যান্য নেশার প্রকৃত ক্ষতি সম্পর্কে জানতে পারে না। এতে তারা সহজেই প্রতারিত হয়ে এমন কিছু চেষ্টা করে বসে, যা তাদের শরীর, মন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে।
৭. অতিরিক্ত অবসর সময়
যখন কারো সময় কাটানোর মতো কোনো ভালো কাজ থাকে না, তখন শূন্যতা ও একঘেয়েমি তাকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। সে সময় শয়তান ও খারাপ সঙ্গীরা মানুষকে এমন কিছুতে জড়ায়, যা তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনে।
Post a Comment